(bn) গুরু সিয়াগ যোগ

গুরু কে ? (Who is a Guru)   

“এই নশ্বর দেহে যাঁকে দেখা যায় তিনি গুরু নন। এই নশ্বর দেহ জরাগ্রস্ত হয়ে একদিন লয়প্রাপ্ত হবে। কিন্তু, গুরু হলেনঐশ্বরিক শক্তি যার বিনাশ নেই। তিনি শাশ্বত এবং চিরন্তন। সাধকের অন্তরের গহন চেতনায় গুরু ক্রমশ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হন।যৌগিক বিজ্ঞানে স্থান ও কালের কোনোই মূল্য নেই। আপনি আমার অন্তরে, আমিও আপনারই অন্তরে। একজন যদিপ্রকৃতই গুরু হন, তবে তিনি সর্বত্রই বিরাজ করেন। যে মুহূর্তে আপনি আমাকে স্মরণ করবেন , আপনি আপনার অন্তরেআমাকে পাবেন। গুরু যদি খাঁটি হন তো তিনি সর্বত্র বিরাজিত — তিনি একইসঙ্গে সর্বত্র উপস্থিত থাকেন ; স্থান -কালেরগণ্ডীতে তাঁকে বেঁধে রাখা যায় না।”

কীভাবে G.S.Y. অনুশীলন করতে হয়?    (What does the practice of GSY involve)

একটি দিব্যমন্ত্র জপ (মানসিক জপ) এবং ধ্যান — G.S.Y. অনুশীলনের এই দুটি দিক। গুরু সিয়াগ সাধক/সাধিকাকে বীজমন্ত্র দানের মাধ্যমে দীক্ষাপ্রদান করেন (যেটি তাকে নীরবে সারাদিনমান ধরে জপ করতে হয়) এবং ধ্যানশিক্ষা দেন।কিছু সময় ধরে নিয়মিত মন্ত্রজপ করলে তা স্বয়ংক্রিয় ভাবেই চলতে থাকে।

যদিও এ বিষয়টি সরাসরি সাধকের আকাঙ্ক্ষার তীব্রতা, বিশ্বাস এবং আন্তরিকতার উপর নির্ভরশীল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সপ্তাহ খানেক অনুশীলনের পরেই মন্ত্রোচ্চারণ স্বয়ংক্রিয় হয়ে ওঠে, অপরাপর ক্ষেত্রে এক পক্ষকাল বা কয়েকমাসও সময় লাগতে পারে। নিয়মিত নামজপ ছাড়াও সাধককে দিনে দুই বা তিনবার (১৫ মিনিট করে) ধ্যানাভ্যাস করতে হয়।

ধ্যান এবং মন্ত্রোচ্চারণ এই দুই একযোগে সুপ্ত কুণ্ডলিনীকে (সাধকের দেহাভ্যন্তরের একটি শক্তিপ্রবাহ বিশেষ) জাগ্রত করে দেয়। জাগ্রত কুণ্ডলিনী স্বতস্ফূর্ত যোগাসন, ক্রিয়া, বন্ধ, প্রাণায়াম ও মুদ্রা সংঘটিত করে; অর্থাৎ, ধ্যান চলাকালীন সাধকের দেহে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই সব যৌগিক ক্রিয়া ঘটে যেতে থাকে।

গুরু সিয়াগ যোগ (GSY) কী?  (What is GSY)

G.S.Y. অর্থাৎ ‘গুরু সিয়াগ যোগা’। G.S.Y অনুশীলনের উৎপত্তি  ঘটেছে ‘সিদ্ধ যোগ’ নামে পরিচিত  যোগেরএক সুপ্রাচীন রূপ  থেকে। পাশ্চাত্যে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা বহুসংখ্যক যোগকেন্দ্রগুলির কারণে এখন যোগ বলতে কিছু শারীরিক  কসরৎ কিংবা দেহকে শক্তিশালী করবার কৌশল বুঝিয়ে থাকে।  যদিও প্রকৃত অর্থে ‘যোগ’ শব্দটিতে’ পরমের সঙ্গে একাত্মতা’ বোঝায়।’সিদ্ধ’ শব্দে বোঝায় — যা ‘পূর্ণাঙ্গ’, ‘নিখুঁত’ অথবা ‘শক্তিমান’।  সিদ্ধ যোগ হলো অনায়াসে পরমসত্তার সঙ্গে যুক্ত হবার উপায়। কেবলমাত্র  সিদ্ধ ( প্রকৃত) গুরুর কৃপাতেই শিষ্যের কোনোপ্রকার প্রচেষ্টা ছাড়াই এটি প্রাপ্ত হওয়া যায়।

 সিদ্ধ যোগ মানবজাতির কাছে যোগ-পরম্পরার অন্তর্গত নাথ সম্প্রদায়ের একটি উপহার। হিমালয়ের দিব্যধামে ভগবান শিবের কাছ থেকে প্রাচীন মুনি মৎস্যেন্দ্রনাথ প্রত্যক্ষভাবে এই যোগের জ্ঞান প্রাপ্ত হয়েছিলেন। দেবাদিদেব শিব সমগ্র মানবজাতির আধ্যাত্মিক বিকাশের জন্য মৎস্যেন্দ্রনাথকে এই জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে আদেশ দিয়েছিলেন। সেই তখন থেকেই জ্ঞান ও প্রজ্ঞাদীপ্ত এই যোগবিদ্যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে গুরু-শিষ্য পরম্পরায় বাহিত হয়ে আসছে। এটি এতই বিশাল যে সকল যোগ-পদ্ধতিই যেমন ভক্তিযোগ, কর্মযোগ, রাজযোগ, ক্রিয়াযোগ, জ্ঞানযোগ, লয়যোগ, ভাবযোগ, হঠযোগ ইত্যাদি সবই এর অন্তর্গত। সেকারণেই একে পূর্ণযোগ বা মহাযোগও বলা হয়ে থাকে।

সিদ্ধযোগ পরমসত্তার সঙ্গে অনায়াসে যুক্ত হবার অন্যতম উপায়। শিষ্যের সামান্যতম প্রয়াস ছাড়াই শুধুমাত্র প্রকৃত সিদ্ধ গুরুর কৃপাতেই এই যোগ প্রাপ্ত হওয়া যায়। ‘অনায়াস’ অর্থাৎ, শিষ্যকে কেবলমাত্র অনুশীলন করে যেতে হয়। তাকে কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের পিছনে ছুটতে হয়না। এতে আধ্যাত্মিক রূপান্তরণ স্বয়ংক্রিয় ভাবেই ঘটে যায়।

 

গুরু সিয়াগ যোগ‘-এর (G.S.Y.) গুরুত্ব (Importance of GSY)

বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বক্তব্যে গুরুদেব এর গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ১৯৯৯ সালে দেওয়া বক্তৃতা।এখানে উনি ‘যোগ কী — সিদ্ধযোগের ইতিহাস ও কার্যকারিতা’র বিষয়ে বলেছেন। একেবারে শেষে আছে যুবসম্প্রদায়েরউদ্দেশ্যে গুরুদেবের বার্তা এবং কেমনভাবে তারা যোগের মাধ্যমে রূপান্তরণকে   সংঘটিত করবে সে-কথা। যোগেরসত্যিকারের সংজ্ঞা কি হওয়া উচিত সে ব্যাপারে মতামত দিয়েছেন।

 তিনি বলেছেন মহর্ষি পতঞ্জলি তাঁর যোগসূত্র গ্রন্থের দ্বিতীয় সূত্রেই যোগকে  “মনের অন্তর্নিহিত বৃত্তিসমূহের নিরোধক” বলেচিহ্নিত করেছেন। যতক্ষণ পর্যন্ত মনের চঞ্চলতা শান্ত ও স্থির না হচ্ছে ততক্ষণ সাধকের পক্ষে ধ্যান কিংবা যোগের অর্থাৎপরমসত্তার সঙ্গে একাত্মতার অনুভূতি লাভ করা সম্ভব নয়। যে সিদ্ধ যোগের কথা আমি বলছি তাতে গুরুই নিজেরআধ্যাত্মিক শক্তিতে শিষ্যের মনের ছুটোছুটি, বিক্ষিপ্ততা রোধ করেন, তাকে শান্ত এবং চিন্তাশূন্য করেন।”

“যোগ পরম্পরায় আমরা যে নাথ সম্প্রদায়ের অনুসরণ করি তা নয়জন মহান নাথযোগী সন্ন্যাসীর দ্বারা পরিচালিত। এইমহতী গুরু পরম্পরায় কলিকালের সূচনায় মৎস্যেন্দ্রনাথই আদিগুরু রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন।”

“গোরক্ষনাথজী ছিলেন মৎস্যেন্দ্রনাথের শিষ্যদের মধ্যে অন্যতম। গোরক্ষনাথজী বেদকে কল্পতরুর (পুরাকথারইচ্ছাপূরণকারী বৃক্ষ) সঙ্গে তুলনা করেছিলেন এবং যোগকে সেই বেদরূপী কল্পতরুর অমৃতফল রূপে বর্ণনা করেছিলেন।সিদ্ধযোগের অনুশীলন সাধককে ত্রিবিধতাপ (যথা শারীরিক, মানসিক এবং আধ্যাত্মিক) থেকে মুক্ত করে। এই তিন বৃহৎসীমানার বাইরে দুঃখের আর কোনো অস্তিত্ব নেই। সিদ্ধ যোগের অনুশীলন অসংখ্য ব্যক্তিকে যাবতীয় রোগব্যাধি থেকেমুক্ত করেছে।”

“ত্রিবিধতাপ দূরীকরণের মাধ্যমে ব্যক্তির এই রূপান্তরণ বস্তুত একটি সুনির্দিষ্ট দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এটি কারোরসৃজনাত্মক কল্পনার মিথ্যা উদ্ভাবন নয়। আমি জানি যে, যৌগিক দর্শনের ব্যাখ্যায় কেউ কেউ কাল্পনিকতার আশ্রয় নেন,কেননা, তাদের সমস্ত উপদেশই নিতান্তই পুঁথিগত এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা বর্জিত। কোনো কোনো ‘গুরু’ এমন কথাও বলেনযে, ২০ বছর অভ্যাসের ফলে সাধকের কুণ্ডলিনী জাগ্রত হওয়া সম্ভব! এক্ষেত্রে আমার বক্তব্য — “গুরু এবং শিষ্য যেপরবর্তী ২০ বছর বেঁচে থাকবেন তার কী কোনো নিশ্চয়তা আছে? ২০ বছর ধরে কোনো কিছুর জন্য কেন লড়াই করবে যখনতুমি তা আজই পেতে পার? এখানে, এইমুহূর্তেই আধ্যাত্মিক সচেতনতা অর্জন করবে না কেন? ২০ বছর অপেক্ষার কথাএকেবারেই বাজে ব্যাপার”

যুবসম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে বার্তা (Message to the Youth)

“শৈশব, কৈশোর বা বয়ঃসন্ধিকালই আধ্যাত্মিকতার পথে যাত্রা শুরু করবার উপযুক্ত সময়। অল্প বয়স থাকতে থাকতেইআধ্যাত্মিক রূপান্তরণ সম্পন্ন হওয়া জরুরি। আমার শিষ্যদের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশই যুবক”

“আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, যুবসম্প্রদায় যতক্ষণ না আধ্যাত্মিক ভাবে সচেতন হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত বিশ্বে কোনো অধ্যাত্ম-বিপ্লব(জাগরণ) ঘটা সম্ভবপর নয়। বিশ্বব্যাপী এক রূপান্তরণের ক্ষেত্রে এই যুবসমাজ ই অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। যুবসমাজএ কাজ অতীতেও করেছে আর ভবিষ্যতেও করবে”

গুরু সিয়াগ যোগ‘-এর (G.S.Y.) গুরুত্ব

বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বক্তব্যে গুরুদেব এর গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ১৯৯৯ সালে দেওয়া বক্তৃতা।এখানে উনি ‘যোগ কী — সিদ্ধযোগের ইতিহাস ও কার্যকারিতা’র বিষয়ে বলেছেন। একেবারে শেষে আছে যুবসম্প্রদায়েরউদ্দেশ্যে গুরুদেবের বার্তা এবং কেমনভাবে তারা যোগের মাধ্যমে রূপান্তরণকে   সংঘটিত করবে সে-কথা। যোগেরসত্যিকারের সংজ্ঞা কি হওয়া উচিত সে ব্যাপারে মতামত দিয়েছেন।

তিনি বলেছেন মহর্ষি পতঞ্জলি তাঁর যোগসূত্র গ্রন্থের দ্বিতীয় সূত্রেই যোগকে  “মনের অন্তর্নিহিত বৃত্তিসমূহের নিরোধক” বলেচিহ্নিত করেছেন। যতক্ষণ পর্যন্ত মনের চঞ্চলতা শান্ত ও স্থির না হচ্ছে ততক্ষণ সাধকের পক্ষে ধ্যান কিংবা যোগের অর্থাৎপরমসত্তার সঙ্গে একাত্মতার অনুভূতি লাভ করা সম্ভব নয়। যে সিদ্ধ যোগের কথা আমি বলছি তাতে গুরুই নিজেরআধ্যাত্মিক শক্তিতে শিষ্যের মনের ছুটোছুটি, বিক্ষিপ্ততা রোধ করেন, তাকে শান্ত এবং চিন্তাশূন্য করেন।”

“যোগ পরম্পরায় আমরা যে নাথ সম্প্রদায়ের অনুসরণ করি তা নয়জন মহান নাথযোগী সন্ন্যাসীর দ্বারা পরিচালিত। এইমহতী গুরু পরম্পরায় কলিকালের সূচনায় মৎস্যেন্দ্রনাথই আদিগুরু রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন।”

“গোরক্ষনাথজী ছিলেন মৎস্যেন্দ্রনাথের শিষ্যদের মধ্যে অন্যতম। গোরক্ষনাথজী বেদকে কল্পতরুর (পুরাকথারইচ্ছাপূরণকারী বৃক্ষ) সঙ্গে তুলনা করেছিলেন এবং যোগকে সেই বেদরূপী কল্পতরুর অমৃতফল রূপে বর্ণনা করেছিলেন।সিদ্ধযোগের অনুশীলন সাধককে ত্রিবিধতাপ (যথা শারীরিক, মানসিক এবং আধ্যাত্মিক) থেকে মুক্ত করে। এই তিন বৃহৎসীমানার বাইরে দুঃখের আর কোনো অস্তিত্ব নেই। সিদ্ধ যোগের অনুশীলন অসংখ্য ব্যক্তিকে যাবতীয় রোগব্যাধি থেকেমুক্ত করেছে।”

“ত্রিবিধতাপ দূরীকরণের মাধ্যমে ব্যক্তির এই রূপান্তরণ বস্তুত একটি সুনির্দিষ্ট দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এটি কারোরসৃজনাত্মক কল্পনার মিথ্যা উদ্ভাবন নয়। আমি জানি যে, যৌগিক দর্শনের ব্যাখ্যায় কেউ কেউ কাল্পনিকতার আশ্রয় নেন,কেননা, তাদের সমস্ত উপদেশই নিতান্তই পুঁথিগত এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা বর্জিত। কোনো কোনো ‘গুরু’ এমন কথাও বলেনযে, ২০ বছর অভ্যাসের ফলে সাধকের কুণ্ডলিনী জাগ্রত হওয়া সম্ভব! এক্ষেত্রে আমার বক্তব্য — “গুরু এবং শিষ্য যেপরবর্তী ২০ বছর বেঁচে থাকবেন তার কী কোনো নিশ্চয়তা আছে? ২০ বছর ধরে কোনো কিছুর জন্য কেন লড়াই করবে যখনতুমি তা আজই পেতে পার? এখানে, এইমুহূর্তেই আধ্যাত্মিক সচেতনতা অর্জন করবে না কেন? ২০ বছর অপেক্ষার কথাএকেবারেই বাজে ব্যাপার।”

error: Content is protected !!