কুণ্ডলিনী কী?
কুণ্ডলিনী হলো স্ত্রীলিঙ্গ বোধক এক দিব্য আধ্যাত্মিক ‘শক্তি’। মানবদেহে এটি সুপ্ত অবস্থায় থাকে এবং গুর সিয়াগের মতন কোনো সিদ্ধ গুরুর কৃপায় জাগ্রত হয়। একবার জাগ্রত হয়ে গেলেই এই শক্তি সকলপ্রকার রোগব্যাধি থেকে দেহকে মুক্ত করে এবং সাধককে আত্ম-সাক্ষাৎকারের পথে নিয়ে যায়। কুণ্ডলিনীর অবস্থান এবং মানবদেহের সঙ্গে তার সম্পর্ক নীচে বর্ণিত হলো :-
মানবদেহের দুই বিপরীত প্রান্তে পুরুষ এবং নারীরূপে ঈশ্বরের অধিষ্ঠান। ওপরে মাথার তালুতে ‘সহস্রার’ নামের এক অতিসূক্ষ্ম, অদৃশ্য বিন্দুতে পুরুষরূপী ঐশ্বরিক শক্তি ‘শিব’-এর বাস। অন্যদিকে নীচে, মেরুদণ্ডের শেষপ্রান্তে ‘মূলাধার’ (শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখার সহায়ক মূল বা শেকড়)নামের সূক্ষ্ম, অদৃশ্য বিন্দুতে দেবী কুণ্ডলিনীর বাস। এই দুই দিব্যকেন্দ্রের মাঝে আছে ছয়টি অতিসূক্ষ্ম, অদৃশ্য চক্র বা মহাজাগতিক শক্তি কেন্দ্র – যেগুলি সূক্ষ্ম সুষুম্না নাড়ীর (মেরুদণ্ডের সঙ্গে সমান্তরালে অবস্থিত) ভিতরে পরস্পরের থেকে অল্পদূরত্বে লম্বভাবে অবস্থান করছে।
মেরুদণ্ডের একেবারে শেষপ্রান্ত থেকে এই চক্রগুলি ওপরের দিকে কণ্ঠ পর্যন্ত উঠে গেছে। কণ্ঠচক্রেরও ওপরে কপালের কেন্দ্রে – দুই ভ্রূর সামান্য উপরে – আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র আছে – যাকে ‘আজ্ঞাচক্র’ বা তৃতীয় নয়ন বলা হয়ে থাকে। উল্লিখিত ছয়টি চক্রই সমস্ত দেহব্যাপী অদৃশ্য ৭২০০০ নাড়ীর (রক্ত প্রবাহ নালিকা) মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত।
কুণ্ডলিনী মেরুদণ্ডের শেষতম প্রান্তে সাড়ে তিন পাকে নিজের লেজের শেষভাগ নিজের মুখে নিয়ে সুপ্ত বা ঘুমন্ত অবস্থায় থাকে। ‘কুণ্ডল’ শব্দের অর্থই সংস্কৃত ভাষায় – ‘পাক’ বা প্যাঁচ। সেকারণেই স্ত্রী-বাচক শক্তির ‘কুণ্ডলিনী’ নাম। নাড়ী, চক্র এবং কুণ্ডলিনী সহ এই গোটা বিন্যাসটিই সত্য; কিন্তু, এতই সূক্ষ্ম যে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এখনও একে চিহ্নিত করতে পারেনি।
কুণ্ডলিনী জাগরণের লক্ষণ
কুণ্ডলিনী জাগরণের সবচাইতে সুস্পষ্ট এবং দ্ব্যর্থহীন লক্ষণ হলো যৌগিক ক্রিয়ার সংঘটন (দেহের আন্দোলন, আসন বা মুদ্রা)। কিন্তু, যদি আপনার ক্রিয়া না হয়ে থাকে? তাহলে, আপনার কুণ্ডলিনী জাগ্রত হয়েছে কি? উত্তর জানতে এই অংশটি পড়ুন।
- করতলে অথবা মাথার তালুতে শীতল বা উষ্ণ প্রবাহ। কোনো কোনো অনুশীলনকারী মেরুদণ্ডেও শীতল বা উষ্ণ প্রবাহ অনুভব করেন।
- ধ্যানের সময় আলো, কোনো রঙ বা বর্ণ কিংবা ভবিষ্যৎ দর্শন। আসন্ন কোনো ঘটনা বা ব্যক্তির বিষয়ে ক্রমাগতএক সজ্ঞালব্ধ জ্ঞানের অনুভূতি।
- আকস্মিক আবেগ তরঙ্গ : আপনার চারপাশে সকলের প্রতি ভালোবাসা এবং সমানুভূতির উদয়। অনেকে র অসম্ভব আনন্দিত এমনকি আনন্দ-চঞ্চল বোধ করে থাকেন। কারো কারো কাছে এটা আবার এক উচ্চাবস্থা – যেন সারাদিন ধরে মেঘের ওপর দিয়ে হাঁটার মতন। আবার অন্যদিকে কিছু অনুশীলনকারী গভীর মানসিক দুঃখ বা বিষাদের প্রকোপ অনুভব করেন এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা কান্নায় ভেঙে পড়েন। যদিও এই দুঃখের অভিভব ও প্রকাশকে পরে কোনো অবদমিত ব্যথার মোক্ষণ বলেই মনে হয়।
- ধ্যানের সময়ে এক প্রসারতা ও গভীরতার বোধ – এক অনন্য আত্মপ্রসারণ – যার কাছে এই দেহকে পর্যন্ত তুচ্ছ মনে হয়।
- কিংবা, কেউ আবার এমনই এক আত্মিক সংকোচন অনুভব করেন যে ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে তাঁর তুচ্ছ বা নগণ্য ব’লে মনে হয়।
- গুরু সিয়াগ যোগের অনুশীলনকারীদের অধিকাংশেরই ধ্যানের সময় কোনোপ্রকার অনুভূতিই হয়না – না কোনো ক্রিয়া, না কোনো সংবেদনা, না আবেগের বিস্ফোরণ, ভিতরের কোনো সূক্ষ্ম হেলদোলও নয়। এঁরা কী করে বুঝবেন এঁদের কুণ্ডলিনী শক্তি জাগ্রত হয়েছে কিনা? গুরু সিয়াগ বলেন, অনুশীলনকারীর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হলো তাঁর জীবনে কোনো পরিবর্তন আসছে কিনা! তাঁর কথায় – “যোগের পথে আসবার পরেও আপনার জীবন যদি আগের মতন একইরকম থেকে যায় – যদি তাতে কোনো উন্নতির লক্ষণ না দেখা দেয় , আপনিএবং আপনার ব্যক্তিত্ব যদি একইরকম থাকে, তাহলে জানবেন যে, আপনার কুণ্ডলিনী জাগ্রত হননি। আপনার সাধনায় কোথাও কোনো খামতি আছে।” যাঁদের ধ্যানের সময়ে কোনো অনুভূতিলাভ হয়নি, তাঁরা তাঁদের জীবনে বড়সড় পরিবর্তন অনুভব করতে পারেন :
- নিয়মিত ধ্যান ও মন্ত্রের মানসজপ অনুশীলনকারীর বৃত্তির পরিবর্তন ঘটায়। খাদ্যাভ্যাসে লক্ষ্যণীয় পরিবর্তন আসে : মদ (এবং অন্যান্য নেশাদ্রব্য) ও মাংসের প্রতি অনীহা ও পরিত্যাগ। শরীরের পক্ষে পুষ্টিকর, সহজপাচ্য খাদ্যের প্রতিয়াকর্ষণ তৈরি হয়, আর অন্যদিকে ক্ষতিকর খাবারের প্রতি বিরূপতা দেখা দিতে থাকে।
- সামাজিক জীবন ও পারস্পরিক সম্পর্কের পরিবর্তন: অনুশীলনকারীর কিছুমাত্র প্রয়াস ছাড়াই অসৎ উদ্দেশ্যপূর্ণ কিংবা নেশাখোর মানুষেরা দূরে সরে যেতে থাকে। অন্যদিকে প্রায়শই আমাদের চারপাশের মানুষজন – তাঁদের কথা কাজ বা তাঁদের উপস্থিতিও আমাদের ইতিবাচকতার দ্বারা প্রভাবিত হয়। অনুশীলনকারী সাধনায় আরও অগ্রসর হলে তাঁর অভ্যন্তরীণ প্রাণশক্তি নেতিবাচকতাকে হটিয়ে দেয়। সাধকের জীবনে তাঁর আধ্যাত্মিক প্রগতির পথে সহায়ক ব্যক্তির আগমন বা পুনঃপ্রবেশ ঘটে থাকে।
- অনুশীলনকারীর স্বভাব ও মেজাজে লক্ষণীয় পরিবর্তন ঘটে : অনুশীলনকারী আরও অন্তর্মুখী ও নিজের স্বভাবের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠেন।আধ্যাত্মিক সচেতনতার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে রাগ বা ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ কমতে থাকে; নিজের ভুলের জন্য অনুশীলনকারী দ্রুত ক্ষমা চাইতে পারেন, করুণা বৃদ্ধি পায়, সর্বোপরি,নেতিবাচকতা দূর করবার ক্ষেত্রে অনুশীলনকারী নিজের যথাযথ ভূমিকা সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠেন।
- আগেই বলা হয়েছে যে, এই লক্ষণগুলিই চূড়ান্ত নয়। কুণ্ডলিনী জাগরণের এই লক্ষণ বিষয়ে একটা গোটা বই লিখলেও হয়তো তা যথেষ্ট হবে না। নীচের ‘কমেন্ট বক্স’–এ এ-বিষয়ে আপনার নিজস্ব, স্বতন্ত্র অভিজ্ঞতা জানাতে ভুলবেন না।
কুণ্ডলিনীকে শক্তি বলার কারণ কী :
হিন্দুধর্মে ‘শক্তি’ হলো স্ত্রী-বাচক ঐশী শক্তি যা এই জগতের সৃষ্টিকর্ত্রী ও সমস্ত বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডে পরিব্যাপ্ত। এই ‘শক্তি’ কেবল জগৎ-রচয়িতাই নন, জগতের যাবতীয় পরিবর্তনের পিছনেও তিনিই চালিকা শক্তি। একদিকে তিনি যেমন এই জগৎ-অস্তিত্বের মূল কারণ, তেমনই আবার এ থেকে মুক্তিলাভেও তিনিই সহায়িকা। বস্তুজগতে নানা ভাবেই তিনি প্রকাশিত হয়ে থাকেন। হিন্দুধর্ম অনুসারে তাঁর নানান দিক বিভিন্ন দেবীমূর্তিরূপে প্রকাশিত – যেমন – অম্বা(বীরত্ব), লক্ষ্মী (সম্পদ),সরস্বতী (জ্ঞান), রাধা (ভক্তি) ইত্যাদি। ঋষিদের দৃষ্টিতে আধ্যাত্মিক বিকাশের পথও তিনিই; এবং তাঁরা এই ‘শক্তি’কে কুণ্ডলিনী নামে অভিহিত করেছেন। তপস্যার মাধ্যমে তাঁরা উপলব্ধি করেছেন যে, এই শক্তিই বিশ্বের মূল চেতনাশক্তি – যা সমগ্র জগৎ ও তার সকল অধিবাসীদের চেতনা প্রদান করছে। (যেকোনো প্রশ্ন থাকলে 9468623528 নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপ করুন বা gssyworld@gmail.com এ ই-মেইল করুন)
কুন্ডলিনী শক্তির সক্রিয়তা
প্রাচীন ভারতীয় দর্শনে কুন্ডলিনী শক্তির উল্লেখ আছে। প্রাচীন ভারতীয় দার্শনিকদের মতে কুন্ডলিনী শক্তিই হল ব্রহ্মান্ডের মুল শক্তি (Cosmic Energy)। মহাবিশ্বের সবকিছুই এই শক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা যে গড, আল্লা, বা ঈশ্বরের উপাসনা করে তা প্রকৃতপক্ষে এই ‘কুন্ডলীনি শক্তি’। এই শক্তি সব কিছুর মধ্যেই আছে। মানুষের মধ্যেও এই শক্তি আছে। যৌগিক দর্শনের মতে আমাদের সুষুম্না কান্ডের সবচেয়ে নীচে ‘মূলাধার চক্রে’ কুন্ডলিনী শক্তি সুষুপ্ত অবস্থায় অর্থাৎ ঘুমন্ত অবস্থায় থাকে। ‘কুন্ডলিনী’ সক্রিয় আছে এমন কোন শক্তি সম্পন্ন গুরু ‘শক্তিপাত দীক্ষার’ মাধ্যমে সাধকের কুন্ডলিনী শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে পারেন। কুন্ডলিনী বিভিন্ন শক্তি চক্র অতিক্রম করে ‘সহস্রার চক্র’তে উপনীত হয়।তখন মানুষ মোক্ষ লাভ করে। ভারতীয় দার্শনিকদের মতে মোক্ষ লাভ করতে কয়েক জন্ম-ও লেগে যেতে পারে।

