(bn) গুরু সিয়াগ যোগ

সূচনাপর্বের জীবন (Early Life)

রাজস্থানের (ভারতবর্ষের অন্তর্গত) বিকানের শহরের ২৫ কিলোমিটার উত্তরে পালানা গ্রামে ২৪ শে নভেম্বর, ১৯২৬ সালেগুরু সিয়াগের জন্ম হয়। উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষা সম্পন্ন হবার পর ১৮ বছর বয়সে গুরু সিয়াগ ভারতীয় রেলে করণিকহিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপরে অচিরেই বিবাহ করে তিনি সংসার জীবনে প্রবেশ করেন। পরবর্তী সময়ে পাঁচসন্তানের (চার পুত্র ও এক কন্যা ) জনক হন।

দিব্য রূপান্তরণ  (Divine Transformation)

১৯৬৮ সালের শীতকাল ছিল গুরু সিয়াগের জীবনের এক সন্ধিক্ষণ। তাঁর দৈনন্দিন, গতানুগতিক জীবন আকস্মিকভাবেইএক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়  যখন শারীরিক কোনো ব্যধি না থাকা সত্ত্বেও এক অজ্ঞাত মৃত্যুভয় তাঁকে গ্রাস করেছিল।স্থানীয় এক ভবিষ্যদ্বক্তা গুরুদেবকে বলেন তাঁকে ‘মার্কেস দশা’ ঘিরে ধরেছে। ‘মার্কেস দশা’ — অর্থাৎ, জ্যোতিষশাস্ত্রঅনুযায়ী গ্রহ-নক্ষত্রের এমন এক বিচিত্র সমাবেশ যা মৃত্যু ডেকে আনে। স্থানীয় কিছু পুরোহিত তাঁকে বলেন যে, এইঅনিবার্য মৃত্যু থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায় এক বিশেষ আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবী গায়ত্রীর কৃপালাভ করা।কেবলমাত্র গায়ত্রীই — যিনি দিব্য আলোকের দেবী–নিষ্ঠুর মৃত্যুর থাবা থেকে তাঁকে রক্ষা করতে পারেন। তাঁকে গায়ত্রী মন্ত্রজপের মাধ্যমে যজ্ঞের অগ্নিকুণ্ডে পবিত্র হবনক্রিয়া করতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। পুরোহিতেরা বলেছিলেন, দেবীর জাগরণসম্পূর্ণ করতে এবং দৈব সুরক্ষা পেতে তাঁকে ১২৫,০০০ বার  মন্ত্রজপ সম্পূর্ণ করতে হবে।

১৯৬৮-র অক্টোবরের নবরাত্রির (শক্তি দেবীর নয়দিনব্যাপী আরাধনা) সময় থেকে গুরুদেব এই অনুষ্ঠান আরম্ভ করেন।প্রতিদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে তিনি গায়ত্রী মন্ত্রোচ্চারণেরর সঙ্গে সঙ্গে গায়ত্রী মন্ত্রের হবন করতেন। মৃত্যুভয় এতইতীব্র ছিল যে, তিনি পরম আন্তরিকতা এবং মনোসংযোগের সঙ্গে এই দৈনিক অনুষ্ঠান পালন করতে থাকেন। এই প্রক্রিয়াসম্পূর্ণ হতে তিন মাস সময় লেগেছিল। সেই দিনগুলির স্মৃতিচারণে গুরুদেব পরে বলেছিলেন যে, তাঁর এতদিনকারজাগতিক জীবনকে পরিবর্তিত করে সে-জীবনকে আধ্যাত্মিকতার পথে পরিচালিত চেয়েই যেন কোনো ঐশ্বরিক শক্তি তাঁকেএই কৃত্রিম ভীতিপ্রদ পরিস্থিতির দিকে চালিত করেছিল। যে দিন এই অনুষ্ঠান শেষ হলো, সেদিন রাতে গুরুদেব শয়নকরতে গেলেন এই ভেবে যে, যেহেতু  এতদিনের শ্রমসাধ্য গায়ত্রী পূজা সমাপ্ত হয়েছে, তাই তিনি পরেরদিন ধীরে-সুস্থেস্বাভাবিক সময়েই উঠবেন। কিন্তু, এতদিনের অভ্যাসের ফলে তিনি পরের দিনও প্রত্যূষেই উঠে পড়লেন। ঘুম ভেঙে চোখখুলে বিছানায় উঠে বসতেই তাঁর মনে হলো যে তাঁর শরীরের ভিতরভাগ এক উজ্জ্বল সাদা আলোয় ভরে গেছে। এমনইউজ্জ্বল সে আলো যে তাকে তিনি আর কোনোকিছুর সঙ্গেই  এমনকি সূর্যের আলোর সঙ্গেও তুলনা করতে পারলেন না।তিনি লক্ষ করলেন যে ঐ আলোক ভিতর থেকে তাঁর শরীরকে দীপ্ত করে রেখেছে। সে-আলো না উষ্ণ, না শীতল — প্রাণজুড়ানো শান্তির এক আশ্চর্য  তরঙ্গ। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এমন এক সুখ ও শান্তির প্রবাহে তিনি মগ্ন হলেন — যার সঙ্গেতাঁর পূর্বপরিচয় ছিল না। এই আলো তাঁকে এক অন্তর্দৃষ্টি দিল। গুরুদেব দেখলেন যে, সেই স্বচ্ছ আলোকে তাঁর দেহাভ্যন্তরউজ্জ্বল হলেও তিনি নিজের শরীরের কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে আলাদা করে দেখতে পাচ্ছেন না — তাঁর গোটা শরীরটাই যেনএক ফাঁপা খোলমাত্র।

অতীতে কখনও রেলের হাসপাতালের মর্গে হেল্পার হিসেবে কাজ করার জন্য মানবদেহের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ,মাংসপেশী ও হাড়ের অবস্থান তাঁর আগেই জানা ছিল । কিন্তু, সেসবের কিছুই তিনি নিজদেহে দেখতে পেলেন না।

পরক্ষণেই একঝাঁক ভ্রমর-গুঞ্জনের মতো ধ্বনির প্রতি সজাগ হয়ে উঠল তাঁর মন। সেই ধ্বনিতে মনোনিবেশ করামাত্রই তিনিবুঝলেন ,ঐ ধ্বনি তাঁর নাভিদেশ থেকে উঠে আসছে। একটু গভীর মনোসংযোগ করতেই অপার বিস্ময়ে তিনি দেখলেন যে, ঐ ভোমরার গুণগুণ স্বর আসলে অত্যন্ত দ্রুতলয়ে উচ্চারিত গায়ত্রী মন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। অনেক পরে তিনিবুঝেছিলেন, যে-গায়ত্রীমন্ত্র একদিন স্বেচ্ছাকৃত প্রয়াসে জপেছিলেন তিনি, তা-ই এখন অনিঃশেষ, স্বয়ংক্রিয় হয়ে তাঁকেদিব্যশক্তির সঙ্গে  চিরকালের জন্য জুড়ে দিয়েছে। ঐ স্বর্গীয় আলোক আরেকটি বিষয়ে তাঁর চোখ খুলে দিল। তিনি বুঝতেপেরেছিলেন যে, জড়জগতে তাঁর  বহির্মুখী অস্তিত্ব ও পরিচিতির বাইরে তিনি এক সম্পূর্ণ পৃথক সত্তা। তিনি তাঁর শরীরীসীমাবদ্ধতা এবং বাহ্যজগতের ব্যক্তিচেতনার সীমায় বদ্ধ নন। তাঁর মনে হয়েছিল, তাঁর ব্যক্তিসত্তা এত বিপুল ব্যাপ্তি লাভকরেছে যে,  সমগ্র বিশ্বকেই তিনি আলিঙ্গন করতে পারেন। প্রকৃতপক্ষে, নিজেকে তাঁর বিশ্বজগৎ বলেই মনে হলো এবং তিনিসে-মুহূর্তে বিশ্বের সজীব- নির্জীব সমস্তকিছুর স্পন্দন উপলব্ধি করতে পারলেন– যেন তারা তাঁর নিজের। ঐ অনন্যঅভিজ্ঞতা তাঁকে এও বুঝিয়ে দিল যে, তিনিই প্রকৃতপক্ষে সেই সর্বব্যাপী, অপরিবর্তনশীল, নিরাকার ঐশ্বরিক শক্তি — সুপ্রাচীন বৈদিক দ্রষ্টারা যাঁকে ‘ব্রহ্ম’ বলেছেন।

যখনই গুরুদেব এই অনন্যসাধারণ, বিস্ময়জাগানো অভিজ্ঞতার মুখে আনন্দ, শান্তি ও প্রেমের তরঙ্গে ভেসে যাচ্ছিলেন ঠিকতখনই সেই অসামান্য দৃশ্য যেমন হঠাৎ এসেছিল তেমনই হঠাৎ ভেঙে গেল। বাথরুমের কলের মুখে তোড়ে জল পড়ারকলকল শব্দ তাঁর এই ঘোর লাগা আচ্ছন্নতাকে যেন ভেঙে দিল।

তিনি যখন কয়েকজন শাস্ত্রবিৎ পণ্ডিতকে তাঁর এই অত্যাশ্চর্য অভিজ্ঞতার কথা বললেন তখন তাঁরা জানাল যে, তিনিসত্যি সত্যিই দেবী গায়ত্রীর আশীর্বাদ ও সিদ্ধি প্রাপ্ত হয়েছেন।

বাবা গঙ্গাইনাথজির সঙ্গে সাক্ষাৎ  (Meeting with Baba Gangainathji)

পরবর্তী পর্যায়ের  আধ্যাত্মিক সাধনার দিনগুলিতে গুরুদেব স্বামী বিবেকানন্দ প্রচারিত বৈদিক দর্শন সম্পর্কে অবহিত হন।স্বামী বিবেকানন্দ  বিংশ শতাব্দীর অধ্যাত্ম-জগতের  মহান প্রতিনিধিস্থানীয় মানবের মধ্যে অন্যতম, যিনি কেবলমাত্রভারতবর্ষেই নয়, সেইসঙ্গে আমেরিকা ও ইউরোপেও বৈদিক আধ্যাত্মিক পুনর্জাগরণ ঘটিয়েছিলেন। বিবেকানন্দ গুরু-শিষ্যপরম্পরার পুন:প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী আধ্যাত্মিক বিকাশের পক্ষে জোরালো সওয়াল করেছিলেন। বিবেকানন্দেরউপদেশ শ্রবণের পরই গুরুদেব আন্তরিক আগ্রহের সঙ্গে গুরুর সন্ধান করতে লাগলেন। গুরুদেবের আত্মীয়দের মধ্যেএকজন তাঁকে এ ব্যাপারে বিকানের-এর ২৭ কিলোমিটার উত্তরে জামশেরর সন্ন্যাসী যোগী বাবা শ্রী গঙ্গাইনাথজির কথাবললেন। ১৯৮৩-র এপ্রিলে গুরুদেব ঐ আশ্রমে যান।

প্রথম সাক্ষাৎকারে উল্লেখযোগ্য তেমন কিছুই ঘটে নি — একদল ভক্ত গঙ্গাইনাথজির উপস্থিতিতে ধ্যানের উদ্দেশ্যে একত্রজড়ো হয়েছিলেন। গুরুদেব সকলের পিছনে বসে সবকিছু নিরীক্ষণ করছিলেন। যেহেতু এই সাক্ষাতে দুজনের মধ্যেকোনোকিছুই আদান-প্রদান হয়নি  সেকারণেই  গুরুদেব কিছুদিন বাদে আবারও বাবার আশ্রমে যেতে মনস্থ করলেন। এইদ্বিতীয় সাক্ষাতেই গুরুদেব বাবার চরণপ্রান্তে নত হয়েছিলেন, বাবাও গুরুদেবের মাথায় হাত ছুঁইয়ে তাঁকে আশীর্বাদকরেছিলেন। বাবা গুরুদেবকে স্পর্শ করা মাত্র গুরুদেব শরীরে প্রবল প্রাণশক্তি অনুভব করলেন; তাঁর দেহের মধ্য দিয়ে যেনবিদ্যুৎ  তরঙ্গ সঞ্চারিত হয়ে গেল। এর মধ্য দিয়েই বাবা যেমন গুরুদেবকে দীক্ষা দিয়েছিলেন, তেমনই একইসঙ্গে তাঁকে যেনদিয়ে গিয়েছিলেন ‘সিদ্ধ গুরু’র উত্তরাধিকার।

গঙ্গাইনাথজির সমাধিলাভ  (Gangainathji takes Samadhi)

১৯৮৩-র ৩১শে ডিসেম্বর, ভোর ৫টায় সমগ্র উত্তর-পশ্চিম ভারত এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে। গুরুদেব পরেজেনেছিলেন, ঠিক ঐ মুহূর্তেই বাবা গঙ্গাইনাথজি তাঁর দেহত্যাগ করেন। অনেক বছর বাদে শিষ্যদের সঙ্গে কথোপকথনেরসময় এ ঘটনা প্রসঙ্গে গুরুদেব বলেছিলেন – “কখনও কখনও কোনো মহাপুরুষের  নশ্বর দেহত্যাগের ঘটনায় ধরিত্রী পর্যন্ত  কম্পিত হয়! এভাবেই প্রকৃতি তাঁর শোক প্রকাশ করে থাকে।”

এই ঘটনার কয়েকদিনের মধ্যেই গুরুদেব একদিন যখন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন — এলাকারই এক তরুণ তাঁকে ডাকলেন। তিনিগুরুদেবকে যা বললেন– তা শুনতে বড়ই অদ্ভুত! সেই যুবকের কথা অনুযায়ী বাবা গঙ্গাইনাথজি নাকি গুরুদেবকেজামসরের সমাধিস্থলে যাওয়ার ব্যাপারে এই যুবককে উপুর্যুপরি বলতে বলছেন। এর প্রত্যুত্তরে গুরুদেব যখন বললেন যে, বাবা যেহেতু আর জীবিত নেই, ফলে, তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎলাভ তো সম্ভবই নয় কখনও — তখন যুবকটি বললেন যে, বাবা স্বপ্নেতাঁকে এই আদেশ দিয়েছেন। এই আহবান শুনে বাবার সমাধিক্ষেত্র দর্শন ও প্রার্থনা নিবেদনের জন্য গুরুদেব সেখানেগেলেন।

বৈদিক চিন্তনের একটি মূল নীতি অনুযায়ী, ব্যক্তির মৃত্যু ঘটলে দেহ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় ঠিকই; কিন্তু, আত্মা চিরন্তন — তারকোনো বিনাশ নেই। চেতনার আলোকদীপ্তিহীন  সাধারণ একজন মানুষ যেখানে তাঁর সঞ্চিত কর্মফলের পরিণামে মারাযায়, সেখানে চেতনাদ্দীপ্ত মহাপুরুষ একটি সুনির্দিষ্ট স্থানে-কালে স্বেচ্ছায় সচেতনভাবে দেহত্যাগ করেন। এহেন সিদ্ধগুরুতাঁর মরদেহ ত্যাগের পরেও তাঁর শিষ্যদের পথ দেখিয়ে চলেন। সেকারণেই একজন সন্তের সমাধিস্থল দিব্য আশীর্বাদেরঅফুরান ধারার উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়।

গুরু গঙ্গাইনাথজির কাছে সমর্পণ  (Surrender to Guru Gangainathji)

“আমার গুরু গঙ্গাইনাথজির কাছে সমর্পণের পরে আমি সম্পূর্ণ পরিবর্তন অনুভব করলাম। আপনিও এই পরিবর্তনেরঅভিজ্ঞতা লাভ করতে পারেন। সমগ্র মানবজাতিই — নারী পুরুষ নির্বিশেষে — এই পরিবর্তন অনুভব করতে পারে। এ জন্যআপনাকে শুধু এটুকুই বুঝতে হবে — কে আপনি? আমি আপনাকে আপনার প্রকৃত সত্তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব — যাতে করে আপনি বুঝতে পারেন – আপনি কে? আপনি এই দেহ নয়। আপনি আসলে সেই অমর আত্মা। সনাতন ধর্মব’লে থাকে যে, আলোকদ্দীপ্ত গুরু ছাড়া মুক্তি সম্ভব নয়। কিন্তু, মুক্তি সহজও নয়। এটা কোনো খেলনা নয় যে, গুরুর সঙ্গেসাক্ষাতমাত্রেই গুরু আপনাকে এটা দিয়ে দেবে। গুরু কেবলমাত্র আপনাকে সঠিক পথের নির্দেশ দেন; বলেন যে, এ-পথেচললে আপনি চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবেন। আর সেই পথ হলো দিব্যমন্ত্রের নিরন্তর জপ। তুলসীদাস গোস্বামী তাঁরসূত্রে বলেছেন যে, কলিযুগে একমাত্র দিব্যমন্ত্রের অনবরত জপেই কেউ সমস্তরকম দুর্ভোগ থেকে মুক্ত হতে পারেন।

ভবিষ্যৎ দর্শন  (Prophetic Vision)

১৯৮৪ সালে গুরুদেব আরেক বিচিত্র ঘটনার সম্মুখীন হলেন, যার গূঢ় তাৎপর্য হয়তো আগামী সময়ে মানবজাতিকেপ্রভাবিত করবে। একদিন রাত্রে বিছানায় শুতে যাবার পর গুরু সিয়াগ স্বপ্নে এক দৃশ্য দেখলেন। তাঁর অস্পষ্ট ধারণা হলোযে, একটি পবিত্র ধর্মগ্রন্থের একটি নির্দিষ্ট অনুচ্ছেদ তিনি স্বপ্নে দেখছিলেন এবং সে-সময়একটি কণ্ঠ তাঁকে বলছিল — “দাউআর্ট দ্যাট, দাউ আর্ট দ্যাট” (তুমিই সেই, তুমিই সেই)।পরেরদিন সকালে উঠে তিনি ভাবতে চেষ্টা করলেন যে, এটা কিনিছকই একটা স্বপ্ন, নাকি কোনো দর্শন? “দাউ আর্ট দ্যাট” – কথাটিরই বা মানে কী? যেহেতু, অনুচ্ছেদটি হিন্দিভাষায় স্বপ্নেদেখেছিলেন, তাই ঐ অনুচ্ছেদের কয়েকটি শব্দও তাঁর মনে ছিল — কিন্তু, সেসবের কোনো অর্থ তিনি খুঁজে পাচ্ছিলেন না।

দিন দুয়েক বাদে গুরুদেবের কনিষ্ঠ পুত্র রাজেন্দ্র একটি পুরোনো পাতামোড়া বই বাড়ি নিয়ে এলেন। রাস্তার ধারের একটিবাড়িতে বইটিকে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে স্কুলছাত্র রাজেন্দ্র বইটির প্রতি এমনই এক দুর্মর টান অনুভবকরেছিলেন যে সেটি তুলে না নিয়ে পারেননি।উদ্দেশ্যহীনভাবে গুরুদেব বইটির পাতা ওল্টাতেই একটি পৃষ্ঠায় একটিঅনুচ্ছেদে তাঁর দৃষ্টি আটকে গেল। এটা ছিল হুবহু স্বপ্নে দৃষ্ট ঐ অনুচ্ছেদটি। কয়েকদিন ধরে বইটি বারংবার পড়েও গুরুদেববইটির বিষয় অনুধাবন করতে পারলেন না। কেবল এটুকুই বোঝা গেল যে, বহু চিত্রবিশিষ্ট ঐ বইতে সরল ভঙ্গিমায়ছোটোদের জন্য খ্রিষ্ট ধর্মের বিশ্বাসের কথা তুলে ধরা হয়েছে। তথাকথিত অর্থে ‘ধার্মিক’ না হবার কারণে হিন্দু শাস্ত্রগ্রন্থেরসঙ্গেই গুরুদেবের বড় একটা পরিচিতি ছিল না — অন্যান্য ধর্মবিশ্বাসের বিষয় তো তাঁর ধারণা ছিল যৎসামান্য।

নিজের পরিচিত মহলে গুরুদেব জিজ্ঞাসা করলেন যে, ধর্মসম্প্রদায় হিসেবে হিন্দুরা যেমন ‘ভগবদ্গীতা’র অনুসরণ করেথাকেন, তেমনি খ্রিষ্টানদেরও কোনো অনুসরণযোগ্য গ্রন্থ আছে কিনা? সেই প্রথম তিনি বাইবেল সম্পর্কে জানতে পারলেন।আরও জানতে পারলেন যে, তাঁর স্বপ্নদৃষ্ট পবিত্র গ্রন্থের ঐ অনুচ্ছেদটি ‘গসপেল অফ জন’-এর একটি অংশবিশেষ, ১৫ঃ২৬-২৭ এবং ১৬ঃ৭-১৫ অধ্যায়। পরে গুরুদেবেরএক বন্ধু তাঁকে বাইবেলের একটি সংক্ষিপ্ত হিন্দি-সংস্করণ উপহারদিয়েছিলেন। তা থেকে খ্রিষ্টান ধর্ম বিষয়ে গুরুদেবের সামান্য ধারণা গড়ে উঠেছিল।

স্থানীয় ল-কলেজের এক অধ্যাপক বন্ধুর সূত্রে তিনি একটি ইংরাজি বাইবেল জোগাড় করলেন। কিন্তু, এতেও খুব একটাসুবিধে হলো না, কেননা, যে অনুচ্ছেদটি তিনি খুঁজছিলেন, সেটি এখানে পেলেন না। গুরুদেব বইটি ফেরত দিয়ে হাল ছেড়েদিলেন এই ভেবে যে — ঘটনাটি চুকেবুকে গেছে। কিন্তু, তা হওয়ার নয়। বরং, তাঁর অন্তরের তাগিদ আরও প্রবল হয়ে উঠল।আরও একবার সন্ধান করতে গিয়ে তিনি জানতে পারলেন যে, খ্রিষ্ট ধর্মও অনেক সম্প্রদায়ে বিভক্ত — তারই দুটি অন্যতমবিভাগ হলো — ক্যাথলিজম ও প্রোটেস্ট্যান্টিজম। যে-বাইবেলটি তিনি পড়ে দেখেছিলেন সেটি ক্যাথলিকেরা মেনে চলেন, অন্যদিকে প্রোটেস্ট্যান্টদের অনুসরণীয় বাইবেলে তাঁর স্বপ্নে দেখা সেন্ট জন গসপেলের অনুচ্ছেদটি আছে।

প্রোটেস্ট্যান্ট বাইবেলের একটি কপি জোগাড় করে গুরুদেব এবার গসপেলটি পড়লেন। বিশেষ করে যে-অনুচ্ছেদটির দিকেতিনি ভিতরে ভিতরে তাড়িত হচ্ছিলেন। গসপেলের ঐ অংশটি ছিল কম্ফোর্টার(পরিত্রাতা)-এর অবতরণ বিষয়ে স্বয়ংযীশুর ভবিষ্যদবাণী। একুশ শতকে যুদ্ধ এবং দুর্ভিক্ষজনিত কারণে যে বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা দেবে তাতেবহুসংখ্যক মানুষ বিধাতার দণ্ডবিধানে শাস্তিভোগ করলেও কম্ফোর্টার সত্যিকারের বিশ্বাসী মানুষদের উদ্ধার করবেন। পরেগুরুদেব জানতে পারেন যে, ‘ওল্ড টেস্টামেন্ট’-এও ভবিষ্যদবক্তা মালাচি যীশুখ্রিষ্টের অবতরণ বিষয়ে (যাঁকে তিনি ‘এলিজা’ ব’লে সম্বোধন করেছিলেন) প্রায় একইরকম ভবিষ্যদবাণী করেছিলেন। পবিত্র ধর্মগ্রন্থের ভবিষ্যদবাণী পড়ে গুরুদেব স্পষ্টবুঝতে পারলেন যে, খ্রিষ্টধর্ম ও ইহুদীধর্মের উৎপত্তিরও হাজার হাজার বছর আগে ‘গীতা’য় ভগবান কৃষ্ণ যে উপদেশদিয়েছিলেন তার সঙ্গে এর কোনও না কোনও সম্পর্ক বা যোগ আছে।

সিদ্ধ গুরুর জীবনযাপন  (Life as a Siddhaguru)

বছর দুয়েক বাদে গুরুদেব গঙ্গাইনাথজির ঐশ্বরিক আদেশ পেলেন যে, তাঁকে রেলের চাকরি ছেড়ে দিয়ে আধ্যাত্মিক মহানউদ্দেশ্য পূরণে সমর্পিত হতে হবে। অবসরের নির্দিষ্ট বয়সকালের প্রায় সাত বছর আগেই ১৯৮৬ সালের ৩০শে জুনগুরুদেব কর্মজীবন থেকে স্বেচ্ছাবসর নিলেন। পরবর্তীকালে তিনি বলেছিলেন — “আগে আমি রেলের সেবক ছিলাম, আরএখন আমি আমার গুরুর সেবক হলাম। এ এমনই এক জীবনব্যাপী কাজ যে ছাড়ার কোনো উপায় নেই। আমি আমারপরিবারের জাগতিক প্রয়োজন পূরণের বিষয়টি পুরোপুরি ওঁনার (গঙ্গাইনাথজি) ওপরেই ছেড়ে দিয়েছি। আমি আমার গুরুরঅনুগত সেবক এবং সেই হিসেবে এই ব্রতের লাভালাভ সবই ওঁনার ইচ্ছানুসারে হবে।”

বাবাও সাধারণ মানুষকে শিষ্যরূপে সিদ্ধযোগে দীক্ষা দেবার জন্য গুরু সিয়াগকে আদেশ দিয়েছিলেন। প্রধানত যোধপুরেএবং রাজস্থানের অন্যান্য কিছু শহরে ১৯৯০ সাল থেকে  ‘দীক্ষানুষ্ঠান’-এর আয়োজন করে গুরুদেব দীক্ষাদান শুরুকরলেন।যাঁরাই গুরুদেবের সান্নিধ্যে এসে তাঁর শিষ্যে পরিণত হয়েছেন তাঁরা তাঁদের জীবনে এক ইতিবাচক পরিবর্তনেরঅভিজ্ঞতালাভ করেছেন — তাঁদের রোগব্যাধি কিংবা দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা সম্পূর্ণ সেরে গেছে — দীক্ষাগ্রহণকালে প্রাপ্ত মন্ত্রজপও ধ্যান নিয়মিত করবার ফলে তাঁদের আধ্যাত্মিক জাগরণও ঘটে গেছে। গুরুদেবের সিদ্ধযোগের অনন্যতা এবংনিরাময়-ক্ষমতার সংবাদ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লে অন্যান্য ছোটো-বড় শহরেও গুরুদেব আমন্ত্রিত হলেন এবংদীক্ষানুষ্ঠানের আয়োজন করলেন। তারপর থেকে ভারতবর্ষের বিভিন্ন শহরে এবং ভারতের বাইরে ইজরায়েল এবংআমেরিকাতেও হাজার হাজার মানুষকে তিনি আধ্যাত্মিক বিকাশ ও সুস্বাস্থ্যের পথে দীক্ষা দিয়েছেন।

যদিও তিনি বলেন যে, তাঁর লক্ষ্যের কেবল অর্ধেকমাত্রই সারা হয়েছে। তাঁর বিশ্বাস — যতক্ষণ পর্যন্ত না তিনি বিশ্বের পশ্চিমগোলার্ধের মানুষের কাছে পৌঁছে তাঁদেরকে গঙ্গাইনাথজির প্রদর্শিত মার্গে অনুপ্রাণিত করে যোগের পথে নিয়ে আসতে সক্ষমহচ্ছেন — ততক্ষণ পর্যন্ত পৃথিবীতে প্রকৃত শান্তি ও সমৃদ্ধির প্রতিষ্ঠা সম্ভবই নয় — “প্রাচ্যের আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে পশ্চিমেরজড়বাদের সমন্বয়সাধন প্রয়োজন, নইলে বিশ্বে দ্বন্দ্ব ও অনৈক্যের অবসান সম্ভব নয়। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের আধ্যাত্মিকযোগের যে-পথ আমি প্রদর্শন করেছি তা-ই বিশ্বে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠাকে বাস্তবায়িত করবে।”

error: Content is protected !!