কখনো কি ভেবে দেখেছেন? “পড়ুন এবং ভেবে দেখুন“
কেন এমন হয় যে একটি শিশু ধনী পরিবারে জন্মগ্রহণ করে এবং জন্মের সাথে সাথে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে যায়?
দ্বিতীয় – একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণকারী, যাকে ভিন্ন ধরণের জীবন সংগ্রামের মুখোমুখি হতে হয়।
তৃতীয় – রাস্তায় জন্মগ্রহণ করে এবং একবেলার খাবার জোগাড় করার জন্য কষ্ট করতে হয়। এখনও এই শিশুরা কোনও কর্ম করেনি, তবুও তিনটি শ্রেণীর শিশুদের জীবনের মধ্যে বিশাল ব্যবধান রয়েছে! এটি এই শিশুদের পূর্বজন্মের কর্মফলের পরিণাম।
আমাদের সবারই কিছু না কিছু সমস্যা থাকেই, যেমন – শারীরিক অসুস্থতা, বাড়িতে বা অফিসে উত্তেজনা, সন্তানদের ভুল পথে চলে যাওয়া, পরিবারে মাদকাসক্তি, স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া, পারিবারিক ভাঙন, সম্পত্তির বিরোধে জড়িয়ে পড়া, ব্যবসায় ক্ষতি, ঋণ পরিশোধের চাপ, দুর্ঘটনায় প্রিয়জনের মৃত্যু, ইচ্ছার বিরুদ্ধে বদলি, কর্মক্ষেত্রে ভুল ধরণের কর্মকর্তার সাথে দেখা, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বস বা মালিকের আপনার সাথে খারাপ আচরণ, আপনার বিবেকের বিরুদ্ধে গিয়ে বাধ্য হয়ে তোষামোদ করা বা ভুল কাজ করা ইত্যাদি।
যদি সমস্যা আসে, তখন যদি বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করেন, তাহলে তবে এটাই পাবেন যে আমরা কোথাও না কোথাও (জ্ঞাতসারে বা অজান্তে) অন্যায় বা অপরাধ করেছি এবং এই সমস্যাগুলির বেশিরভাগই সেই কর্মের ফলাফল। যখনই আমরা কোন সমস্যায় পড়ি বা সমস্যার সম্মুখীন হই, তখন আমরা একে আমাদের ভাগ্য বা আমাদের পূর্বজন্মের কর্মের ফলাফল বা ঈশ্বরের ইচ্ছা বলে মনে করি। এটা আমাদের ভ্রম। যদি আমাদের কর্মের ফল ভোগ করতে হয়, তাহলে মন্দির, মসজিদ, গির্জা, গুরুদ্বার ইত্যাদিতে যাওয়ার কী দরকার? যদি তুমি গরম তাওয়া স্পর্শ করো, তাহলে তোমার হাত কেবল এই জন্মেই পুড়ে যাবে, পরের জন্মে নয়। যদি তুমি ক্রমাগত অতিরিক্ত নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করো, তাহলে তোমার শরীর এই এইজীবনে অসুস্থ হবে, পরের জন্মে নয়।
কিন্তু তখনই প্রশ্ন ওঠে যে যদি কর্মফল তাৎক্ষণিকভাবে প্রাপ্ত হয়, তখন বর্তমান জন্ম কীভাবে পূর্ববর্তী জন্মে করা কর্মের ফল? এই প্রসঙ্গে গুরুদেব বলেন যে, একজন ব্যক্তির জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যে কৃত কর্ম অনুসারে (ভালো বা খারাপ) কর্মফল ভোগ করতে হয়। যদি এই জনমে কর্মফল ভোগ সম্পূর্ণ না হয়, তবে তা পরবর্তী জন্মে ট্রান্সফার হয়। আমাদের বর্তমান ঘরে জন্ম আমাদের পূর্বজন্মের কর্মের ফল। পূর্ববর্তী জন্মের সঞ্চিত কর্মের উপর ভিত্তি করে বর্তমান জন্ম ঘটে।
আসুন একটি উদাহরণ দিয়ে এটি বোঝার চেষ্টা করি – একজন কৃষক কঠোর পরিশ্রম করে যে ফসল ফলান তাতে তার এক বছর চলতে পারে, যদি এক বছর চলার পরও অবশিষ্ট থাকে তবে পরের বছর ও চলে যাবে। যদি ফসল ভালো হয়, তাহলে একই বছরে লাভ হবে। যদি বাম্পার ফসল ফলে, পরের বছরও চলে যাবে। আবার যদি এটি লোকসানের ফসল হয়,তবে তার ক্ষতিও হয় এই বছরে অথবা পরের বছর বহন করতে হবে। একইভাবে, আমাদের সারা জীবনের কর্ম (ভালো বা খারাপ) যাই হোক না কেন, আমরা এই জন্মেই তার কর্মফল পাব ভালো বা খারাপ ভাবে। যদি কর্মফলের ভোগ এই জন্মে সম্পন্ন না হয়, তবে তা পরবর্তী জন্মে (সুখী বা দুঃখী) সম্পূর্ণ হবে।
‘ঈশ্বরের কৃপা’ সবার উপর সমানভাবে বর্ষিত হয়। যদি আমরা অন্তরআত্মার আওয়াজ শুনে কাজ করি, তাহলে প্রত্যেকেই (আমরা যে পরিবারেই জন্মগ্রহণ করি না কেন) উন্নতি করার সুযোগ পাবো। বর্তমান জন্মে করা কর্মের উপর নির্ভর করে, একজন সুখী ব্যক্তি পরবর্তী জন্মে অসুখী ঘরে জন্মগ্রহণ করতে পারেন অথবা একজন অসুখী ব্যক্তি সুখী ঘরে জন্মগ্রহণ করতে পারেন। সাধনার মাধ্যমে, বর্তমান জন্মের উন্নতি করা যায় এবং পরবর্তী জন্মকে উন্নতির দিকে নিয়ে যাওয়া যায়। যেমন সূর্য, মেঘ, বাতাস, বৃষ্টি ইত্যাদি সকলের জন্য সমানভাবে উপলব্ধ। একইভাবে, আধ্যাত্মিক অনুশীলনের মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি সকলের জন্য সমানভাবে উপলব্ধ। কিন্তু সময়ের অভাবে আমরা হয় সেই সাধনার নিয়মগুলি সম্পূর্ণরূপে অনুসরণ করতে পারি না অথবা আমরা আচার-অনুষ্ঠানে জড়িয়ে পড়ি এবং অজান্তেই সময় নষ্ট করি।
অন্যায় করা, তোষামোদের মাধ্যমে অন্যায় কাজ করা, ভুল উপায়ে ইনকাম করা, চিকিৎসার নামে কমিশন এবং আরও বেশি আয়ের জন্য ব্যয়বহুল চিকিৎসা, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও ওষুধ লিখে দেওয়া, নিম্নমানের নির্মাণকাজ করা, ঘুষ নিয়ে কাজ করা, পদের অপব্যবহার করা, দুর্বল বা অসহায়দের অসহায়ত্বের সুযোগ নেওয়া, মহিলা সহকর্মীদের প্রতি বিদ্বেষ বা পদোন্নতি/বোনাসের নামে তাদের শারীরিক শোষণ করা, ভেজাল পণ্য বিক্রি করা, প্রতারণা করে দামি বা ভুল পণ্য বিক্রি করা, শিশুদের জোর করে টিউশনের জন্য শিক্ষা দেওয়া, ভুয়া বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রতারণা করা, ভুল দাবি উত্থাপন করা, সুপারিশ বা তোষামোদের ভিত্তিতে পদোন্নতি দেওয়া, মিথ্যা মামলা লড়াই করা বা তাদের ফাঁদে ফেলা ইত্যাদি – আমরা এই সব থেকে বাদ যাই না। তাই, আমাদেরও আমাদের কর্মের পরিণতি কোন না কোনভাবে ভোগ করতে হবে কারণ প্রতিটি কর্মের ফলাফল নিশ্চিত। কোম্পানির মালিক/কর্মকর্তারা যেভাবে কম বেতন দিয়ে কর্মীদের উপর বেশি কাজের চাপ চাপিয়ে শোষণ করেন, তাতে তারা অল্প বয়সেই মানসিক চাপজনিত রোগের (উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, রক্তচাপ, হার্ট অ্যাটাক, ডায়াবেটিস ইত্যাদি) শিকার হন। একইভাবে, সেই মালিক বা কর্মকর্তারাও এই রোগগুলির শিকারও হতে পারে।
আজকাল, প্রায় সর্বত্রই পরিষেবা চার্জ বা ঘুষ ছাড়া কাজ সম্পন্ন হয় না। অনেক সময় আমরা বলি যে উপরের লোকদেরও ভাগ দিতে হবে, তাই আমরা আদায় করছি। কিছু ব্যবসায়ী/কোম্পানি তাদের ইচ্ছামত কাজ করার জন্য কর্মকর্তাদের ঘুষ দেয়, আবার কেউ কেউ কাঙ্ক্ষিত পদ পেতে উচ্চতর কর্তৃপক্ষকে ঘুষ দেয়। দুর্নীতি ও ঘুষের এই খেলা উপর থেকে নিচ পর্যন্ত প্রায় সর্বত্রই চলছে।
এই সব কি? আমরা সবাই এটা জানি, কিন্তু তবুও আমরা এটা করছি। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ভুল কাজ করার জন্য চাপ দেন, আর আমরা তাদের সমর্থন করি। ‘উপরেরটি’ অবশ্যই তাদের কর্মফল দেবে, আমরাও এতে অংশীদার হব। আমরা এটাও বুঝতে পারি না যে, সংগ্রহ করার সময়, আমরা একই অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ ব্যবহারের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ি এবং আমাদের কর্মফল নষ্ট করি। আমাদের মনে রাখা উচিত যে আমরা যদি অন্যদের দ্বারা করা ভুল কাজের সাথে জড়িত থাকি, তাহলে আমরাও কর্মফলের অংশীদার হব।
অনেক সময় কেরানি বা অফিসাররা বলেন যে না চাইলেও সবাই জোর করে পয়সা দিয়ে যান; এটা নিজের সাথে স্পষ্ট প্রতারণা। সত্য কথা হলো, দুর্নীতির কারণে মানুষেরা এতটাই সমস্যাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন যে, কাজ শেষ হওয়ার পরও আমাদের চেহারা দেখেই এবং পরবর্তী কালে হয়তো আবারও কাজ পড়বে এই কথা ভেবে তারা টাকা পয়সা অফার করেন। এই ভাবে আমরা আমাদের নিজস্ব কর্মফল খারাপ করছি।
অনেক সময় আমরা দেখি যে যারা অন্যায় বা অপরাধ করে, তারা অনেক বড়লোক এবং ক্ষমতাশালী হয়। কেউ তাদের কিছুই করতে পারে না। তারা তাদের পূর্বজন্মের অতিরিক্ত সঞ্চিত কর্মের ফলে প্রাপ্ত সুখ উপভোগ করছে কিন্তু একই সাথে তারা দ্রুত নিজেদের পতনের পথ প্রস্তুত করছে। সেই লোকেরা তাদের পূর্বজন্মের কর্মফলের কারণে যে পুণ্যের কলসি ভরে গিয়েছিল তা খালি করছে। খারাপ পথে অর্থ উপার্জন করে এবং তারপর দানধ্যান, পূজা বা তীর্থযাত্রা করে কিছুই অর্জন হবে না। এটা তোমার মন কে শুধুমাত্র মিথ্যা আশ্বাস ই দিচ্ছে। এমনকি যদি তুমি তোমার অন্যায় কাজগুলো অন্যদের কাছ থেকে গোপন করো, কিন্তু ‘অন্তরাত্মা’র কাছে তো লুকোতে পারবে না, কর্মফল ভোগ করতেই হবে।
মানুষ মনে করে আজকাল টাকা পয়সাই সবকিছু। এজন্যই সে যতটা সম্ভব টাকা আয় করতে চায়। কিন্তু খারাপ উপায়ে, কাউকে প্রতারণা করে, কাউকে কষ্ট দিয়ে, অথবা পদের অপব্যবহার করে অর্জিত অর্থ কেবল দুর্দশাই ডেকে আনবে। এটা নিশ্চিত। যখন আমরা সাংসারিক কোনো কাজের জন্য বা ইনকাম বাড়াবার জন্য, বিবেকের বিরুদ্ধে গিয়ে মন্দ কাজ করি, তখন তার প্রতিফল ভোগ করার জন্য আমাদের মানসিক ভাবে প্রস্তুত থাকতেই হবে। পাপের পথে আমার যে ইনকাম করি, সুদ সমেত সেই পয়সা রোগভোগ বা অন্য সমস্যার মাধ্যমে খরচ হয়ে যাবে। আমরা নিজেদের প্ল্যান অনুযায়ী তা ভোগ করতে পারব না। আমাদের সন্তানরাই খারাপ রাস্তায় চলে সবকিছু ধ্বংস করে দেবে। আমরাও নানা ধরণের শারীরিক বা মানসিক রোগভোগ বা টেনশনে ভুগতে থাকবো ।
কর্মফলের এই পরিণাম কেবলমাত্র অবৈধভাবে অর্জিত উপার্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আমরা যদি জেনেশুনে, অর্থ বা ক্ষমতার অহংকারে, কাউকে আঘাত করি বা অপমান করি, অথবা অন্য কারো উপর আমাদের রাগ প্রকাশ করি, তাহলে আমরা তাদের কাছ থেকেও ব্যথা, অপমান এবং আঘাত পাব। আশীর্বাদের যেমন প্রভাব থাকে, তেমনি একজন অসহায়, দরিদ্র বা দুর্বল ব্যক্তির অভিশাপেরও সমান প্রভাব থাকে।
আমরা কাকে ভালো বলবো কাকেই বা খারাপ বলবো? কি ভাবে সেটা বুঝতে পারবো? ঈশ্বরের শক্তি যেমন বাইরে থাকে তেমনি আমাদের ভিতরেও থাকে। আমাদের কি ঠিক কি ভুল সেই সম্পর্কে সচেতন করে, একেই আমরা বিবেকের আওয়াজ বলি। যদি আমরা সেই আওয়াজ শুনতে পাই, তাহলে আমাদের প্রায় কোনও কাজই ভুল হতে পারে না। যদি কর্ম ভালো হয় তবে এই জীবনে প্রায় কোন সমস্যাই থাকবে না। কিন্তু আমরা অজান্তেই সেই আওয়াজ কে না শোনার ভান করে থাকি। এখান থেকেই ঝামেলার সূত্রপাত হয়। যদি আমরা আমাদের বিবেকের আওয়াজ শুনে চলি,তবে যে প্রয়োজন মেটাবার জন্য আমরা পাপের রাস্তায় চলে অন্যায় উপায়ে অর্থ উপার্জন করতে হচ্ছে, সেই প্রয়োজন ঈশ্বরের ইচ্ছায় নিজে নিজেই পূরণ হয়ে যায়। তাহলে আমরা দেখতে পাব যে ‘ঈশ্বর’ আমাদের কাজের দায়িত্ব নিজের হাতে নেন এবং কোনও কাজে কোনও সমস্যা হতে দেন না।
‘এ আমরা সবাই জানিযে আমরা ভুল করছি’ এবং তবুও আমরা তা করতেই থাকি। কেন এমন হয়? এর মূল কারণ হল কাম, ক্রোধ, লোভ, আসক্তি, মোহ এবং অহংকার, যা জন্ম থেকেই আমাদের মধ্যে বিদ্যমান। কিন্তু মস্তিষ্ক কে ব্যবহার করে এদের পরাজিত করা সম্ভব নয়। কথা প্রবচন এবং ধর্মোপদেশ শুনিয়েও তাড়ানো যায় না। এগুলো সবই আমাদের ভেতরে বিরাজমান প্রবণতার ফলাফল। তামসিক প্রবণতার (লোভ, চুরি, মিথ্যা, কাম, নিপীড়ন, ঘুষ, অলসতা, অবহেলা,অনিয়ন্ত্রিত নেশা ইত্যাদি) আধিপত্যের কারণে আমরা জেনে হোক বা না হোক, ভুল কাজ করেই যাই। যদি আমরা ঈশ্বরের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক স্থাপন করি, তাহলে এই তামসিক প্রবণতাগুলি সাত্ত্বিক প্রবণতায় (প্রেম, সততা, সত্য, করুণা ইত্যাদি) রূপান্তরিত হয়। তারপর আমাদের কাজ সহজেই সম্পন্ন হতে শুরু করে। কিন্তু এর জন্য কী করতে হবে?
ঈশ্বরের সাথে আন্তরিক সংযোগ স্থাপনের জন্য আমরা ধ্যানের যেকোনো পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারি। কিন্তু ধ্যানের প্রতিটি পদ্ধতিতে, একজনকে কিছু ত্যাগ করতে হবে বা গ্রহণ করতে হয়। তার মানে কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। যার কারণে আমরা সেই পথে হাঁটতেও পারছি না। আপনার কি আধ্যাত্মিক উন্নতির তীব্র আকাঙ্ক্ষা আছে কিন্তু কী করবেন জানেন না? কোন পথ সঠিক আর কোনটা ভুল? সঠিক মনে হওয়া পথ বেছে নেওয়ার পর দেখা যায় যে, এটি অনেক দীর্ঘ এবং এর অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কি ভাবে একটা সহজ এবং সরল মার্গ খুঁজে পাবো? আসুন একটি উদাহরণ দিয়ে এটি বোঝার চেষ্টা করি।
পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার জন্য অনেক ধরণের পথ থাকতে পারে যেমন সিঁড়ি, ঢালু পাকা পথ, কাঁচা পথ, পাথরের উপর দিয়ে ওঠা, গাছের মধ্য দিয়ে ওঠা ইত্যাদি। যেকোনো পথে অবিরাম চলতে থাকো, আমরা আমাদের গন্তব্যে পৌঁছাবোই, আমাদের যা করতে হবে তা হল অবিরাম এগিয়ে যাওয়া। মাঝপথে যাত্রা থামিয়ে দিলে, তুমি তোমার গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে না। আমরা আমাদের সুবিধা অনুযায়ী যেকোনো রুট বেছে নিতে পারি। আমরা যেকোনো সময় রুট পরিবর্তন করার চেষ্টা করতে পারি, কিন্তু যাত্রা থামানো উচিত নয়। কিন্তু প্রতিটি আরোহণের রুটের নিজস্ব নিয়ম আছে যা অবশ্যই মেনে চলতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, সিঁড়িতে হিলযুক্ত জুতা উপযুক্ত হবে না, এবং পাথরের পথে চপ্পল উপযুক্ত হবে না। কিছু পথে আপনার কাঠের সাপোর্ট লাগবে, কিছু পথে আপনার দড়ি লাগবে। কিছু পথ ছোট কিন্তু আরোহণ খাড়া ইত্যাদি। এই রাস্তাগুলিতে মানুষের যাত্রা বিভিন্ন কারণে বন্ধ হয়ে যায়, যেমন, কেউ হাঁটুর ব্যথার কারণে আরোহণ করতে পারেন না, কারও পিছলে যেতে সমস্যা হয়, কারও শ্বাসকষ্ট হয়, কারও সম্পদের অভাব হয় এবং কারও সময় থাকে না। কারণ যাই হোক না কেন, যাত্রা কোনও না কোনও কারণে থেমে যায়। অনেক সময় আমরা মাঝপথে থেমে যাই এবং বিনোদনে ব্যস্ত হয়ে পড়ি।
একইভাবে, ‘পরমাত্মার’ সাথে সংযোগ স্থাপনের অনেক উপায় রয়েছে। আমরা যে পথই বেছে নিই না কেন, আমরা আমাদের গন্তব্যে পৌঁছাবোই। কিন্তু প্রতিটি রুটের নিজস্ব নিয়ম আছে, যদি সেগুলি অনুসরণ না করা হয় তবে যাত্রা থেমে যাবে, এবং লোকেরা দোষারোপ করবে যে ‘ঈশ্বর’ শোনেন না। সময়ের অভাবে আমরা মন্দির, মসজিদ, গুরুদ্বার, গির্জা ইত্যাদির দেখানো পথের নিয়ম পুরোপুরি অনুসরণ করতে পারি না এবং পথ সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে পড়ি। যদিও কোন পথই ভুল নয়, সব পথই লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যায়। একইভাবে, গুরুদের দেখানো পথে অনেক ধরণের বিধিনিষেধ রয়েছে,যার কারণে সেই পথ অনুসরণ করা বা এমনকি নিয়ম মেনে চলাও কঠিন। নিয়ম মেনে চলতে না পারার কারণে, আমরা সেই কাজের দায়িত্ব পরিবার বা পণ্ডিত, পুরোহিত, পাথি, মৌলভি ইত্যাদির উপর ছেড়ে দিই। তাহলে আমরা কীভাবে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পেতে পারি? এটাকে এভাবে বোঝানো যায় – যখন আমরা কাউকে ভালোবাসি, তখন আমরা নিজেরাই তা করি এবং সেই ভালোবাসার মাঝে কাউকে আনি না। কিন্তু যখন আমাদের ঈশ্বরের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে হয়, তখন আমরা উপাসনার দায়িত্ব অন্যদের উপর অর্পণ করি। ফলাফল কেমন আসবে? পরীক্ষায় পাস করতে হলে নিজেকেই পড়াশোনা করতে হবে।
যদি আমরা দেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে পরিচিত হই, তাহলে আমাদের কোনও কাজই আটকাবে না। যখন একজন মানুষের সাথে পরিচয় জীবনের প্রায় সব সমস্যা দূর করতে পারে, তখন ভাবুন – যদি ‘ঈশ্বরের’ সাথে সংযোগ বা পরিচিতি থাকে, তাহলে কি কোনও কাজ বন্ধ হয়ে যাবে? ‘ঈশ্বরের’ সাথে এই সংযোগ স্থাপনের জন্য, আমরা সকলেই আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে নিজ নিজ প্রার্থনা স্থলে যাই। কখনও কখনও মনে হয় যে ‘ঈশ্বর’ আমাদের প্রার্থনা শোনেন, আবার কখনও কখনও মনে হয় যে তিনি তা শোনেন না। মনে এ প্রশ্নও জাগে যে, কেন প্রত্যেক বারই কেনো প্রার্থনা শোনেন নাl?কেন এমন হয় যে কিছু জিনিস না চেয়েই পূরণ হয়ে যায়? অনেক সময় মনে হয়, সমস্যায় পড়ে প্রার্থনা করলে শুনছেন না। আমি লোকেদের বলতেও শুনেছি যে তারা অনেক প্রার্থনা, উপাসনা, পূজা আর্চা, নামাজ ইত্যাদি করে, কিন্তু তারা জানে না যে “ঈশ্বর” কোথায়? ঈশ্বর শুনতেই পাননা। খুবই খারাপ পরিস্থিতিতে আছি, সব কিছু করে দেখেছি, কোনও কিছুতেই কাজ হচ্ছে না।
আসুন আমরা একটি উদাহরণ দিয়ে এটিও বোঝার চেষ্টা করি। আকাশে যে বিদ্যুৎ চমকায় তা লক্ষ লক্ষ ভোল্টের, কিন্তু আমরা তা দিয়ে আমাদের ঘরের বাল্ব জ্বালাতে পারি না। এই বিদ্যুৎ আলো উৎপন্ন করে, কিন্তু এই আলো আমাদের ইচ্ছায় আসে না। বিদ্যুৎ কেন্দ্রে লক্ষ লক্ষ ভোল্ট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় এবং আমাদের পুরো ঘর সেই বিদ্যুৎ দিয়ে আলোকিত হয়। বজ্রপাতের সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই, এটি আমাদের আলো সরবরাহ করে কিন্তু আমাদের ইচ্ছানুযায়ী বা আমরা যেখানে চাই সেখানে নয়। কিন্তু একই বিদ্যুৎ, যখন তার এবং ট্রান্সফরমার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে আসে, তখন পুরো ঘর আলোকিত হয়।
এর মানে হল যে ‘উপরওয়ালা’র সাথে কিছু সংযোগকারী মাধ্যমেরও প্রয়োজন। আমরা যে শক্তিগুলোর উপাসনা করি, সেগুলো বিদ্যুতের মতো, যারা আমাদের চাহিদার ভিত্তিতে নয়, বরং নিজের ইচ্ছায় তাদের আশীর্বাদ প্রদান করে। এই শক্তিগুলির সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের উপায় আমাদের জানা নেই। এগুলোর সাথে সংযোগ স্থাপনের জন্য আমাদের সংযোগকারী তারের প্রয়োজন। ‘ধ্যান’ হল সেই সংযোগকারী তার।
যদি আমরা চিন্তা করি, তাহলে দেখতে পাব যে, সত্যযুগের দেব-দেবী, ত্রেতাযুগের রাম-সীতা অথবা দ্বাপরযুগের কৃষ্ণ-রাধা অথবা বর্তমান যুগের বুদ্ধ, মহাবীর, নানক, মোহাম্মদ, মূসা, যীশু, কবীর, রইদাস, মীরা, বিবেকানন্দ ইত্যাদি শারীরিকভাবে সাধারণ মানুষের মতোই ছিলেন। তাহলে তাদের দেহে আলাদা ভাবে কী ছিল যা তাদেরকে পূজনীয় করে তুলেছিল? উত্তর হবে যে, ঐ সকল মানুষের কিছু সচেতন শক্তি ছিল, যা আমাদের নেই! সেই শক্তির নাম কুণ্ডলিনী শক্তি। এই শক্তি সেই সকল মানুষের মধ্যে জাগ্রত হয়েছিল যা তাদেরকে বিশিষ্ট বানিয়েছিল। কুণ্ডলিনী শক্তি আমাদের সকলের মধ্যেই বিদ্যমান, কিন্তু তা সুপ্ত। তাদের সকলের ‘প্রদীপ’ জ্বলছিল। আমাদের কাছে প্রদীপ, তেল এবং সলতে আছে, কিন্তু সেই ‘প্রদীপ’ নিভে আছে। তাই প্রদীপে কোন আলো নেই। সেই একই ‘প্রদীপ’ জ্বালানোর জন্য আমরা প্রার্থনা, উপাসনা, ভক্তি, নামাজ ইত্যাদি করি। যদি ‘প্রদীপ’ ভেতরে থাকে, তাহলে বাইরে থেকে কীভাবে জ্বলবে? এই নিভে যাওয়া প্রদীপটি মন্ত্র এবং ধ্যানের মাধ্যমেও জ্বালানো যেতে পারে। ধ্যানের শক্তি আমাদের ভেতর থেকে ‘পরম সত্তার’ সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।
যদি আমরা চেষ্টা করতে ইচ্ছুক হই, তাহলে একটি সহজ পদ্ধতি (GSSY) আমাদের ভেতরের কণ্ঠস্বর শুনতে এবং সেই পথে চলার শক্তি প্রদান করে। GSSY (গুরু সিয়াগ সিদ্ধ যোগ) হল ধ্যানের একটি খুব সহজ ধরণ যা নিঃশুল্ক ভাবে বাড়িতে করা যেতে পারে। এই পদ্ধতিতে, কাউকে কোথাও যেতে হবে না, কোনও কিছু ত্যাগ করতে হবে না, কোনও খাবার দাবার নিয়েও কোনও বাছ বিচার নেই। এই ধ্যান-বাড়ি, অফিস, গাড়ি ইত্যাদি যেকোনো জায়গায় করা যেতে পারে।
যদি এখনও পর্যন্ত অন্য কোনও মার্গ অনুসরণ করে আপনি ‘ভেতরের কণ্ঠস্বর’ অনুসরণ করতে সফল না হন, তাহলে আপনি ৯৪৬৮৬২৩৫২৮ (9468623528)নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপ করে অথবা ৭৯৭৬২৫১৯১৬ (7976251916) নম্বরে কল করে এই পদ্ধতি (GSSY) সম্পর্কে তথ্য পেতে পারেন। এই পদ্ধতিতে, ধ্যান এবং মন্ত্রের মাধ্যমে, আমাদের আহ্বান ভেতর থেকে সেই ‘ঈশ্বরের’ কাছে পৌঁছায় যার কাছে আমরা প্রতিদিন আমাদের সমস্যা দূর করার জন্য বা আধ্যাত্মিক অগ্রগতির জন্য প্রার্থনা করি। যেসব কাজ বা ইচ্ছা পূরণের জন্য আমরা অন্যায় কর্ম করে, সেই কাজগুলো বা ইচ্ছা সহজেই পূরণ হতে শুরু করে যদি আমরা এই পদ্ধতি অনুসরণ করি।
“আমরা যদি জীবিত থাকাকালীন মোক্ষলাভ অথবা স্বর্গ সুখ চাই, তবে এই ধ্যান এবং মন্ত্রই তা অর্জনের মূল চাবিকাঠি। একবার চেষ্টা করেই দেখুন।যদি আপনার কোনও ইচ্ছা পূরণ না হয় বা আপনি কোনও সমস্যা থেকে মুক্তি না পান, তবে এই মন্ত্রজপ এবং ধ্যান করে চেষ্টা করতে পারেন।”
“ধ্যান গুরু সিয়াগ সিদ্ধ যোগাভ্যাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মন্ত্রজপ ও ধ্যান একই অনুশীলনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ধ্যানের তাৎপর্য কী? বর্তমান বিশ্ব এখন ধ্যানের বিষয়ে অধিকতর আগ্রহী হয়ে উঠছে। কেননা জড়বিজ্ঞানও একথা স্বীকার করেছে যে – ধ্যানের সময় ব্যক্তি সম্পূর্ণ ভাবে একাগ্রচিত্ত হতে পারলে প্রথাগত চিকিৎসা পদ্ধতির তুলনায় ধ্যান সম্পূর্ণ রূপে রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে অধিকতর সুফল প্রদান করে।”
“যদিও সেই পরিমাণ মনোযোগ লাভ করা খুবই কঠিন । বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মও ধ্যান কে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। কিন্তু, তারা ধ্যানকে অতিক্রম করে যাবার কথা কখনোই বলেনি। ধ্যানের উপকারিতা নিয়ে আজকাল আধুনিক সমাজে খুবই উৎসাহ লক্ষ করা যাচ্ছে। চিকিৎসক কিংবা অন্য যে-কেউই এই বিষয়ে অনেক কথা বলছেন। কিন্তু, কেউই প্রকৃত পক্ষে সম্পূর্ণ রূপে এর তাৎপর্য বোঝাতে সক্ষম হননি।”
“প্রকৃত অর্থে ধ্যান হলো- সমাধি লাভের পূর্ববর্তী অবস্থা। মহর্ষি পতঞ্জলি নির্দেশিত অষ্টাঙ্গিক যোগের চূড়ান্ত পর্যায় কে সমাধি বলা হয় । পতঞ্জলি তাঁর সুপ্রাচীন গ্রন্থ ‘যোগসূত্র’-তে ধ্যানের বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন। এই গ্রন্থে মহর্ষি পতঞ্জলি যে অনুশাসন গুলি নির্দেশ করেছেন তাতে সাধককে অধ্যাত্ম-সাধনায় আটটি ক্রমিক পর্যায় অতিক্রম করতে হয় : যম ( নৈতিক নিয়মাবলী), নিয়ম ( আত্মশুদ্ধি ও অধ্যয়ন), আসন (অঙ্গবিন্যাস), প্রাণায়াম ( শ্বাসবায়ুর নিয়ন্ত্রণ), প্রত্যাহার (ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণ), ধারণা (লক্ষ্য/একাগ্রতাবৃদ্ধি) , ধ্যান(মেডিটেশান) এবং সমাধি (তদাত্মতা লাভ)।”
“প্রথম পাঁচটি পর্যায় যেখানে বস্তুজগতের সঙ্গে সম্পর্কিত , সেখানে শেষ তিনটি পর্যায় — ধারণা, ধ্যান ও সমাধি সূক্ষ্ম জগতের বিষয়। ধারণার পর্যায়টি সফলভাবে অতিক্রম না করলে সাধকের পক্ষে ধ্যান বা তার পরবর্তী পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব নয়। শুধুমাত্র নিজেকে ধ্যানাবস্থায় কল্পনা করে কখনওই কারও পক্ষে প্রকৃত ধ্যানাবস্থা লাভ করা সম্ভবপর নয়। অন্তর্জগতে সত্যিকারের পরিবর্তন এলে , সেইসঙ্গে কিছু অভিজ্ঞতার সমাবেশ ঘটলে এবং আপনার সমস্যার বাস্তবিক বা জাগতিক সমাধান লাভ হলে পরেই আপনার ‘ধারণা’ ( যা কিনা ধ্যানের ভিত্তিস্বরূপ ) সুদৃঢ় হতে পারে। অর্থাৎ, শুধুমাত্র যখন আপনি অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের সাথে সাথে এইরূপ জাগতিক সমস্ত সমস্যার সমাধান প্রাপ্ত হন , তখনই আপনি সার্থকভাবে ধারণার পর্যায়ে উন্নীত হন। এবং একবার ‘ধারণা’য় দৃঢ় হতে পারলে আপনি ধ্যানের ক্ষেত্রে একাগ্র হতে পারবেন। এই একাগ্রতা লাভের জন্য আপনার মনকে আজ্ঞাচক্রে নিবিষ্ট রাখা জরুরি। সুতরাং, মহর্ষি পতঞ্জলির ব্যাখ্যা অনুসারে ধ্যান হলো সমাধির পূর্বাবস্থা। এবং যখন আপনি একাগ্রতার সঙ্গে ধ্যানে ডুবে যেতে সক্ষম হবেন, স্বাভাবিকভাবেই আপনি সমাধির পর্যায়ে উন্নীত হবেন।”

